Friday, August 11, 2017

নূরের শহরে (৩) - আল্লাহর দুই বান্দা

মাসজিদুল হারাম আর মাসজিদে নববী। আল্লাহর আশিক যারা, আল্লাহর সন্তুষ্টি যারা খুঁজে ফেরেন, আল্লাহর হুকুমের যারা পাবন্দ, নবীর সুন্নাতের যারা অনুসারী; আল্লাহর প্রতি, আল্লাহর প্রিয় নবীর প্রতি ভালোবাসা যাদের অন্তরে বদ্ধমূল, পৃথিবীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমন বান্দারা প্রতিনিয়ত ছুটে আসেন এই পবিত্র জমিনে। এই দুই শহরের আলো বাতাসে, এই দুই মাসজিদের ছায়ায় আসতে না পারলে তাদের যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। অনেক বোকারা ভাবে, হজ্ব তো ফরজ একেবারই, এতবার যাওয়ার কি আছে? যিয়ারতের জন্য তো একদিনই যথেষ্ট, এতদিন মদিনায় কি দরকার? যাদের অন্তরে আল্লাহর মহব্বত নেই, যাদের কাছে ইসলাম মানে শুধুই কিছু নিয়মতান্ত্রিক কাজ, যেগুলো নিতান্ত বাধ্য হয়ে করতে হয়, তারা কী বুঝবে কাবার দিকে তাকিয়ে থাকার আনন্দ? যাদের কাছে নবীজি কেবলই একজন বার্তা বাহক, যাদের অন্তরে নেই আমাদের প্রিয় নবীর ভালোবাসা, নেই তাঁকে দেখার তামান্না, তারা কী বুঝবে যিয়ারতের জন্য ধীর পায়ে হেটে যাওয়ার সময় মনের অবস্থা? তাদের দিলে এসবের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু যাদের দিলকে আল্লাহ তাঁর নিজ রহমতে সজীব রেখেছেন, সেখানে ঢেলেছেন তাঁর মহব্বত, তাঁর হাবিবের মহব্বত, তারা তো এখানে আসবেই! বার বার আসবে। তাই এই পবিত্র দুই আঙিনায় খুঁজে পাওয়া যায় আল্লাহর এসব প্রেমিকদের। যদি কেউ খুঁজতে চায়।

সেরকমই এক বান্দার দেখা পেয়ে গেলাম প্রথম দিনই। মাগরিবের নামাজের জন্য মাকে পৌঁছে দিয়েছি মহিলাদের নামাজের অংশে। আমি আর বাবা চলে এসেছি মসজিদের বেশ ভেতরের দিকে। মাগরিব আর এশার মধ্যে গ্যাপটা খুব বেশি না, তাই মাগরিব পরে মসজিদেই আমলে বসে থাকলাম। বাবার জন্য লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকা, বা মেঝেতে বসে থাকাও কষ্টকর। উনি বসে আছেন চেয়ারে, কুরআন তিলাওয়াতে ব্যস্ত। আমি বাবার পেছনেই বসে আছি, মাঝে মাঝে হাটাহাটি করছি। এমন সময় চোখ গেলো আমাদের থেকে কয়েক কাতার সামনের দিকে। হুইলচেয়ারে বসে আছেন একজন বয়স্ক লোক। একটু সামনে এগিয়ে ভালো করে দেখলাম। সাদা ধবধবে আপদমস্তক। মাথায় সাধারণ পাঁচ-কলি টুপি, গায়ে সাদা সুন্নতি লেবাস। পায়ের সালোয়ার 'নিসফে সাক' অর্থাৎ হাটু আর গোড়ালির মাঝ বরাবর। পুরোটাই ধবধবে সাদা। আর এমন উজ্জ্বলতা কখনও কি দেখেছি কারও চেহারায়? লালচে ফর্সা চেহারাটা ঢেকে আছে মুখভর্তি সাদা দাঁড়িতে। অসম্ভব সুন্দর, শান্ত সেই মুখ। মানুষটাকে দেখা মাত্রই একটা কথাই মনে হলো, ইনি আল্লাহর এক প্রিয় বান্দা। উনার সাথে আমাকে দেখা করতেই হবে। আজব একটা আকর্ষণ আমাকে টেনে নিয়ে গেলো সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষটার দিকে।

উনার আশেপাশে দেখলাম সুন্নতি লেবাসে কয়েকজন বসে আছেন, স্পষ্টতই তারা আমাদের আশেপাশের কোনো দেশের, এবং ওই মুরব্বির মুরিদ। পেছনে বসে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,

- উনি কি আপনাদের শায়খ?
- জি
- উনার পরিচয় ?
- উনি তো ফিরোজ মেমন সাহেব, হাকিম আখতার (র) এর খলিফা।

সুবহানাল্লাহ! ফিরোজ মেমন সাহেবের নাম তো আমি শুনেছি আগেই। আর পাকিস্তানের হজরত হাকিম মুহাম্মদ আখতার সাহেব (র) এর নাম না জানা কি সম্ভব? এখন তো তার সাথে হাত না মিলিয়ে যেতে পারবো না!

- আমি উনার সাথে মুসাফাহা করতে পারি ?
- অবশ্যই, কেন নয় ?

পেছন থেকে এগিয়ে গিয়ে হজরতের সামনে গিয়ে বসলাম, সালাম দিয়ে মুসাফাহা করলাম। অসম্ভব আন্তরিক একটা হাসি দিয়ে তার নরম হাতের মধ্যে নিয়ে নিলেন আমার হাত। কি প্রশান্তি ছিল উনার সেই হাসিতে, সেই মুসাফাহায়! হযরতকে পরিচয় দিলাম, বললাম আমার বাবা মায়ের সাথে এসেছি বাংলাদেশ থেকে। খুব খুশি হলেন। সেই সাথে ঢাকার কোনো একজন বড় আলেমের নাম বললেন, এখন মনে নেই, যার সাথে উনার খুব ভালো ইসলাহী সম্পর্ক। হজরতের কাছে দুআ চেয়ে ফিরে আসলাম আগের জায়গায়। এসেই বাবাকে বললাম, ঐ যে উনি একজন আল্লাহওয়ালা, পাকিস্তানের বুজুর্গ ব্যাক্তি। উনার এপিয়ারেন্স বাবাকেও মুগ্ধ করেছিল। বাবা বললো, চল সালাম দিয়ে আসি। বাবাকে নিয়ে গেলাম হজরতের কাছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হজরত তার হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাবার সাথে মুসাফাহা করলেন, শরীর-স্বাস্থ্যের খবর নিলেন, বিনয়ের সাথে। দুই মুরব্বির হাসিমাখা মিলনের দৃশ্যটা খুবই সুন্দর ছিল। একটু পরে বাবা বললেন, এটা আমার ছেলে, কিছুদিন পর ওর বিয়ে ইনশাআল্লাহ, ওদের জন্য বিশেষ দুআ চাই। হজরত খুশি হয়ে আমার দিকে ফিরলেন, দুআ করলেন। সুবহানাল্লাহ! যার বিয়ে তার নিজের তো খবর ছিল না এব্যাপারে দুআ চাইতে, অথচ বাবার মাথায় ঠিকই ছিল। আসলে বাবা-মায়েরা এমনই হয়। ছেলে মেয়েদের ভালো থাকা, খুশি থাকা নিয়ে চিন্তা তাদের মাথা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যায় না।

رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا


-----------------------------------------------------------------------------------------------------

আল্লাহর আরেক আশেক বান্দা, দ্বীনের এক একনিষ্ট খাদেম, আমার অসম্ভব প্রিয় এক ব্যক্তিত্বের সাথেও আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছিলেন তার পরের দিনই। যোহরের নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হচ্ছি। হোটেলে ফিরে যাবো, আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন দরজা দিয়ে বের হচ্ছিলাম সেটা এখন মনে নেই। গেটের বেশ কিছু দূর থেকেই গেটের কাছে কয়েকজন মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, কথা বলছেন। এতদূর থেকে চেহারা স্পষ্ট না দেখা গেলেও, একজনের অবয়ব পরিচিত মনে হলো। হ্যা সেরকমই তো পোশাক, চোখে চশমা, দাড়িও সেরকম হালকা লালচে। মাঝারি গড়নের, যেমনটা দেখেছিলাম আগে একবার। উনি কি তবে.......???

Bucket List এর সাথে পরিচিত আছেন? জীবনে আপনি কি কি করতে চান, মৃত্যুর আগে? পৃথিবীর কোন কোন সৌন্দর্য আপনি ঘুরে দেখতে চান? কি ধরণের adventurous কাজ করতে চান, অন্তত একবার হলেও? এরকম টার্গেটের লিস্টকে Bucket List বলে। আমার এরকম একটা লিস্ট আছে। জীবনে অন্তত একবার হলেও, যেসব মানুষের সাথে আমি সাক্ষাৎ করতে চাই, কথা বলতে চাই, এরকম মানুষদের একটা লিস্ট। এই লিস্টে আছেন এমন কিছু মানুষ, যাদের influence আমার জীবনে অনেক। যাদের লেখনী, যাদের লেকচার আমার নিজের মানসিকতা গঠনে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আমার দ্বীনী understanding, দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে আমার concept, অর্থাৎ বুঝ-সমঝের ক্ষেত্রে এসব মানুষের অবদান অনেক। দ্বীন মানা এক জিনিস, আর দ্বীনের বুঝ অন্য জিনিস। আর এই দ্বিতীয়টার গুরুত্ব অনেক বেশি। যেসব দ্বীনি ব্যক্তিদের কথা, লেখা আমাকে শিখিয়েছে কুরআনের শিক্ষা, হাদিসের শিক্ষা, তাদের কাছে আমি চির ঋণী। আর উনাদের তালিকায় একেবারে প্রথম দিকেই যার নাম, তিনি মুফতি ত্বকী উসমানী।

বর্তমান সময়ে যারা দ্বীনের উপরে কিছুটা হলেও চলার চেষ্টা করছেন, শেখার চেষ্টা করছেন, তাদের মধ্যে মুফতি ত্বকী সাহেবকে চেনেনা এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। উনার কেবল পরিচয় তুলে ধরতেও কয়েক পৃষ্ঠা লেগে যাবে। দ্বীনের কোন শাখায় নেই উনার কন্ট্রিবিউশন? একদিকে উনি ফিকহ এবং হাদিসের অনেক বড় উস্তাদ, পড়াচ্ছেন দারুল উলুম করাচিতে। ইসলামী অর্থনীতিতে তিনি সারা পৃথিবীতে একজন লিডিং রিসার্চার। উনার সম্মানিত পিতাও ছিলেন সারা দুনিয়ায় সুপরিচিত একজন আলেমে দ্বীন, মুফতি শফি উসমানী (র)। বাপকা বেটা যাকে বলে। মুফতি ত্বকী সাহেব হাদিসের সনদ পেয়েছেন যাদের থেকে তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন শায়খ যাকারিয়া (র), মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (র), ক্বারী তৈয়ব সাহেব (র) এবং মাওলানা সলিমুল্লাহ খান (র)। এখানেই শেষ না। তাজকিয়ার মেহনতেও আছেন প্রথম সারিতে। হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানভী (র)-এর দুজন বিশিষ্ট খলিফা ড. আব্দুল হাই আরিফী (র) এবং মাওলানা মাসীহুল্লাহ খান (র) এর খেদমতে থেকে সুলূকের পথে হেঁটেছেন। দুজনের থেকেই খিলাফত লাভ করে আত্মশুদ্ধির পথ দেখাচ্ছেন অগণিত মুসলিমদের, যারা উনার হাতে বায়আত হয়েছেন। এসব দ্বীনি ব্যস্ততা সত্ত্বেও আইনে পড়াশোনা করেছেন, পাকিস্তানে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন! এছাড়া লিখেছেন আশিটিরও অধিক দ্বীনি কিতাব; উর্দু, ইংরেজি এবং আরবি ভাষায়। সুবহানাল্লাহ! একেই বলে বরকত। আমার দ্বীনি বুঝ-সমঝ গঠনে উনার বয়ান, লিখিত বই এবং প্রবন্ধের ভূমিকা অনেক বেশি। কয়েক বছর আগে উনার একটা বয়ান সরাসরি সামনে বসে শুনার তৌফিক হয়েছিল ঢাকায়। অল্প সময়ের সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো এখনো গেথে আছে আমার মন-মস্তিষ্কে, আশা করি থাকবে সারা জীবন। তবে সেবার উনার সাথে দেখা করার সুযোগ হয়নি, তাই একটা আফসোস ছিল মনে মনে।

গেটের আরেকটু কাছে যেতেই আর সন্দেহ থাকলো না। দাঁড়িয়ে আছেন মুফতি ত্বকী উসমানী সাহেব! সাথে আরো দুই জন। অনেকটা মন্ত্র মুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। হজরত খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কথা বলছিলেন বাকিদের সাথে, চেহারার এক্সপ্রেশন খুবই সিরিয়াস। তারপরও সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। দুহাতে মুসাফাহা করলেন হজরত, সালামের উত্তর দিলেন। ইচ্ছা হচ্ছিলো কিছু কথা বলতে, দুআ চাইতে, কিন্তু আমি ঢুকে পড়েছি তাদের conversation এর মধ্যে, তাও বেশ সিরিয়াস বিষয়ে নিশ্চয়ই। তাই আর দেরি করলাম না, প্রচন্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও উনাদের ছেড়ে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আল্লাহর দেয়া হঠাৎ এই সুযোগ বিশ্বাস করতেও সময় লাগলো কিছুক্ষণ। আমি আসলেই মুফতি ত্বকী সাহেবের সাথে হাত মেলালাম? আলহামদুলিল্লাহ। সেই সাথে আবার আফসোসও হলো, এতো কাছে এলাম, মুসাফাহা হলো, কিন্তু কথা হলো না, দুআ চাওয়া হলো না? মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

কাহিনী এখানেই শেষ হলেও সেটা হতো অন্যতম স্মরণীয় একটা ঘটনা। তবে এই গল্পের ২য় পর্ব যে এখনো বাকি, সেটা আমি কিভাবে জানবো?

এশার নামাজ পড়লাম মসজিদের পুরোনো অংশে, অর্থাৎ একেবারে সামনের দিকে। বাবুল সালাম থেকে বাবে বাকি'র দিকে যিয়ারতের যে রাস্তা, তার ঠিক পেছনে সারি সারি শেলফ আছে সোনালী রঙের, কোরআনের মুসহাফ রাখা। এরকমই একটা শেলফের পেছনে এশা পড়লাম। জামাত শেষ হলো, সুন্নতের জন্য দাঁড়ালাম একটু দেরি করেই। তখন জায়গায়টায় মুসল্লিদের চাপ কমে গেছে অলরেডি। আমার দুপাশে কেউ নেই। বিতর নামাজ পড়ছি, ঠিক পাশেই একজন এসে দাঁড়ালেন নামাজে। ভদ্রলোক যখন রুকুতে গেলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার এপিয়ারেন্সের দিকে নজর গেলো। কি ব্যাপার? মনে তো হচ্ছে ...... । সালাম ফিরিয়ে ঝট করে পাশে তাকালাম। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। আমার ঠিক পাশে নামাজ আদায় করছেন শায়খ ত্বকী উসমানী! এতটা সৌভাগ্য আমার কপালে কিভাবে জুটলো? এতো বড় মসজিদে নামাজ পড়ার জায়গার কোনো অভাব নেই। আমার প্রিয় মানুষটা এসে দাঁড়ালেন ঠিক আমারই পাশে?

হজরতের নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করলাম। উনার ব্যাপারে একটা কথা আগেই শুনেছি কার কাছে যেন। মা'মুলাত অর্থাৎ নিয়মিত আমলের ব্যাপারে উনি এতটাই punctual, যেন আমলটা তখন না করলে আর করাই হবে না। আমলের দিকে এমনভাবে ছোটেন, যেন ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এবার দেখতে পেলাম স্বচক্ষে। নামাজের সালাম ফেরানোর সাথে সাথেই এক হাত বাড়িয়ে দিলেন সামনের শেলফে, কোরআন হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। এবার আমাকে একটু স্বার্থপর হতেই হলো। ভাবলাম যা করার উনি তিলাওয়াত শুরু করার আগেই করতে হবে। সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। নিজের পরিচয় দিলাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে হজরত খুশি হলেন। এরপর দুআ চাইলাম। দুটো স্পেশাল দুআ চাইলাম, হজরত আমিন বললেন! সেই সাথে হজরত নিজে থেকেই আরও কিছু দুআ করতে লাগলেন। হাসি হাসি মুখে কি দুআ করছিলেন হজরত, আমি ভালো করে শুনতে পাইনি, খুশির একটা ঘোরের মধ্যে কেবল বলে যাচ্ছিলাম, আমিন! আমিন! আমিন! দুআ শেষ করেই হজরত হাতে থাকা কোরআন খুলে বসলেন, ট্রেনটা ছুটেই যায় কিনা। এবার আর বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না ভেবে উঠে এলাম। যাওয়ার পথে ফিরে ফিরে দেখছিলাম শায়খকে, চোখে তখনও অবিশ্বাস। এরকম একজন মানুষের সাথে দেখা হবার, দুআ চাওয়ার সুযোগ কিভাবে পেলাম? মসজিদের এতো দরজা থাকতে, আমরা কিভাবে একই গেটে একত্রিত হলাম দুপুরে? আবার ঐদিনই এশার পরেই, এই সুবিশাল মসজিদের এতো জায়গা থাকতে, কিভাবে ঠিক পাশাপাশিই আল্লাহ দাঁড় করালেন আমাদের? আল্লাহ তাআলা যেন বুঝিয়ে দিলেন, আল্লাহ যদি দিতে চান, তিনি কারও যোগ্যতার পরোয়া করেন না। যোগ্যতা ছাড়াও তিনি দেন, চাইলেই দেন। আবার কখনো না চাইতেও দেন। আল্লাহর রহমতের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়। আমার মতো অলস, অযোগ্য, অপদার্থ বান্দাকেও আল্লাহ এতটা ভালোবাসতে পারেন, কাছে টানতে পারেন, উপহার দিয়ে ভরিয়ে দিতে পারেন! কিভাবে করবো এর শুকরিয়া? কিভাবে আল্লাহকে জানাবো কৃতজ্ঞতা? ভাষা নেই। শুধু সেই শব্দগুলো ছাড়া, যা তিনিই শিখিয়েছেন তাঁর বান্দাদের.....

الْحَمْدُ لِلَّـهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ


---------------------------------------------------------------------------------------------------

Sunday, August 06, 2017

নূরের শহরে (২) - উপহারের রাত

আমাদের হোটেলটা ছিল একেবারে মসজিদে নববীর চত্বর ঘেঁষে। মধ্যরাতের পর যখন পৌঁছলাম, এশার নামাজ তখনও বাকি আমাদের। সবাই খুব দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নেমে এলাম। মদিনার ঠান্ডা ঠান্ডা রাতের আবহাওয়ায় এসে দাঁড়ালাম মসজিদের বাইরের সাদা চত্বরে। কতদিন পর আল্লাহ আবার নিয়ে এলেন। ১৫ বছর আগে, তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি, বাবা মা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের ৩ ভাই বোনকে। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলেই খুব মনে পড়তো এই শুভ্র, শান্তিময় খোলা চত্বরটার কথা। আবারও বাবা মায়ের হাত ধরেই এলাম এবার। আলহামদুলিল্লাহ। এই নিয়ামত আল্লাহ আরও অনেক অনেক বাড়িয়ে দিন। আমিন।


আমাদের ছোট জামাতটার ইমাম হয়ে নামাজ পড়ালাম। হুজুর হুজুর দেখতে হওয়ার কারণে, আর কয়েক পারা মুখস্ত থাকায় প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় নামাজ পড়াতে হয়। এমনকি ঢাকার এক মসজিদেও একবার ফজরের নামাজ পোড়ানোর তৌফিক হয়েছিল, কোনো এক ৩ দিনের জামাতে থাকার সময়! কিন্তু এবারের এই নামাজ পড়ানোটাই আমার কাছে সবচেয়ে স্পেশাল ছিল, কারণ এবার দাঁড়িয়ে আছি মসজিদে নবনীর দেয়াল ঘেঁষে! তবে খুশির সাথে ভয়টাই বেশি ছিল সেই সময়। দাঁড়িয়ে আছি কোথায়! এই জায়গায় নামাজ পড়ানো কি, নামাজ পড়তেই তো বুক কাঁপার কথা আমার মতো মানুষের। মানুষকে নাহয় ধোঁকা দিয়েছি দাড়ি আর টুপি দিয়ে, বড় বড় নসিহত দিয়ে। আল্লাহ তো জানেন, ভেতরের খবর! আল্লাহ মাফ করুন, কবুল করুন। 

বাবা মা সহ আমদের সাথের বাকি ৩ জনেরও বয়স যথেষ্ট। বিশেষ করে বাবা মা সারাদিনের সফরের পরে একেবারেই ক্লান্ত তখন। ওই সময় তাদের সবচেয়ে প্রয়োজন ভালো একটা রেস্ট। ফজরেও তো উঠতে হবে। তাই সবাই ঠিক করলেন হোটেলে ফিরে যাবেন। যিয়ারতের জন্য অনেক হাটা প্রয়োজন, সেই শক্তি কারো শরীরেই নেই তাদের, থাকার কথাও না। কিন্তু আমি? মসজিদে নববীর দরজা থেকে ফিরে যাবো ভেতরে না ঢুকেই? আমার কি এতটা ক্লান্তি আসার কথা ত্রিশ বছর বয়সে? মসজিদের দালানের অপর প্রান্তেই তো শুয়ে আছেন আমার নবী (স) । যদি প্রশ্ন করে বসেন যখন দেখা হবে, কিরে, সেদিন এতো কাছে এসেও ঘুমুতে চলে গেলি? সালাম দিয়ে গেলি না? আমার চেহারা তুই দেখবি না অবশ্য, কিন্তু আমি তো তোর চেহারাটা দেখতাম! তোর হাসি আর কান্না মাখা মুখটা দেখতাম। তোর সালামের জবাব দিতাম! 

বাবা মা-কে জানালাম, আমি তো যিয়ারত না করে যেতে পারছি না। উনারাও সেরকমই এক্সপেক্ট করেছিলেন বোধহয়। বাবাই দেখিয়ে দিল 'বাবুস সালাম ' এর রাস্তা। আল্লাহ তার জান্নাতের রাস্তা সহজ করুন।

মসজিদের বাইরের সাদা চত্বর তখন অনেকটাই ফাঁকা, হালকা সাদা আলোয় আলোকিত। তবে দূর থেকে যখন বাবুস সালামের খোলা দরজাটা চোখে পড়লো, ভেতরের সোনালী আলো যেন ঠিকরে বের হয়ে আসছে। বাইরের রাতের আলোয় মসজিদের চত্বর আর দেয়ালের মাঝে, সেই খোলা দরজাটা থেকে যেন উপচে পড়ছে সোনালী আলো! আমার মতো সাধারণের চোখে তো কেবল ভেতরের ঝলমলে ঝাড়বাতির আলোই চোখে পড়ে, তবে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা নিশ্চয়ই অন্য কোনো আলো দেখতে পান! নিশ্চয়ই!

মসজিদের এই গেটে সবসময় মানুষের স্রোত। এই গভীর রাতেও তার ব্যতিক্রম নেই। মানুষের স্রোত চলছে সামনের দিকে, যত সামনে আগাচ্ছি, চাপ ততই বাড়ছে। হবারই তো কথা। প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ (স) তো মাত্র কয়েক কদম দূরেই! উনাকে সালাম জানানোর এই মিছিল চলছে, চলবেই। যতদিন দুনিয়াতে থাকবে তাঁর অনুসারীরা, তাঁকে মহব্বতকারীরা।

ধীরে ধীরে কাছে চলে আসছে পবিত্র রওজা মুবারাক। অল্প কিছু সামনেই সবুজ-সোনালী জালি। আরও কিছু পা, আরও একটু কাছে। আশেপাশের প্রতিটা মানুষের মুখে তখন দরূদ ও সালামের ধ্বনি, সেই সাথে কান্নার আওয়াজ। দরূদ, দুআ আর কান্না মিলে একটা মৃদু গুঞ্জন। কারো কান্না চাপা, কারওটা জোরে, আর কারওটা বাঁধ ভাঙা! আর আমারটা?

নবীজির রওজা চলে এলো। মানুষের স্রোত অনবরত লেগে থাকার কারণে এখানে দাঁড়াতে দেয়া হয় না বললেই চলে। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম প্রিয় হাবিবকে, ভেজা চোঁখে। সালাম দিলাম তাঁর দুই প্রাণ প্রিয় সঙ্গীকেও। সে সময়ের অনুভূতির বর্ণনা দিতে যাচ্ছি না, দিতে পারবোও না। আবেগ প্রকাশের সে পরিমান দক্ষতা আমার নেই। শুধু বলবো সালাম শেষে দরজা দিয়ে যখন বেরিয়ে আসছি, দুচোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। এতুটুকু পানি ঝরাতে পারাও আল্লাহর নেয়ামত, অনেক বড় নেয়ামত আমার মতো অযোগ্য বান্দার জন্য। 

যিয়ারত করে হোটেলে ফিরে যাওয়ার অলস নিয়ত ছিল, কিন্তু 'দিল' মানলো না, জোর করে আবার ঢুকিয়ে দিলো মসজিদে, একই পথে। কিছুদূর আগাতে দেখি এক জায়গায় অনেক মানুষের জটলা, সবাই যেন সামনের দিকে কোথাও যেতে চাচ্ছে। কিন্তু সেটা তো যিয়ারতের লাইন নয়। একটু পরে বুঝতে পারলাম। মসজিদে নববীর মিম্বার আর রওজার মাঝের অংশটাকে প্রিয় নবী (স) জান্নাতের টুকরা বলে গেছেন। এই জায়গাকে 'রিয়াদুল জান্নাহ' বলে। জান্নাতের বাগান। এখানে দু রাকাত নামাজ পড়ার জন্য, একটু হাত উঠিয়ে দুআ করার জন্য মানুষের ভিড় লেগেই থাকে সারাক্ষণ। রাত তখন দুটারও বেশি বাজে বোধহয়। এখনও কত মানুষ! কি মনে হলো জানিনা, মানুষের ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম।

খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছে বান্দাদের স্রোত। রিয়াদুল জান্নাহর সীমানা কোনো দেয়াল দিয়ে ঘেরা না, খোলাই। তবে চিহ্নিত করা আছে কার্পেটের ভিন্ন রং দিয়ে। মসজিদের বাকি সব অংশের কার্পেট লাল, এই ছোট অংশটা সাদা, বা অনেকটা ক্রীম কালারের। যারা সুযোগ পাচ্ছে ভেতরে একটু নামাজ পড়ার, তারা খুব সহজে জায়গা ছাড়তে চায় না। আর না ছাড়লে পেছনের বেচারারাও সুযোগ পায়না। এজন্যই এই ধীর গতি। তবুও এগোতে লাগলাম অল্প অল্প করে। এভাবেই প্রায় আধা ঘন্টা পার হয়ে গেলো।

বামপাশে তাকিয়ে দেখলাম রাসূল (স) এর রওজার দেয়াল একসময় প্রায় বরাবর এসে গেলো। আরও এগোলাম, খুব ধীরে। মুখে কেবল দরূদ পরে যাচ্ছি। হঠাৎ পায়ের নিচে তাকাতেই দেখি, লাল কার্পেট নেই, সাদা! আমি ঢুকে গেছি জান্নাতের বাগানে! খুব দ্রুত একটু খানি জায়গা পেয়ে গেলাম। মসজিদের মুয়াযযিন সাহেবের আযান দেয়ার একটা উঁচু প্ল্যাটফর্ম আছে, আমি জায়গায় পেলাম এই প্ল্যাটফর্মের পিলার ঘেঁষে। দুই রাকাত নামাজ পড়লাম, বেশি সময় না নিয়ে। দুআ করলাম হাত তুলে, সেটাতেও খুব দেরি করলাম না। এই পবিত্র জায়গায় এসে কে উঠে যেতে চায়? কে চায় নামাজকে, দুআকে সংক্ষিপ্ত করতে? কিন্তু ওই আমার বামপাশে যিনি শুয়ে আছেন, যার মহব্বতে এখানে ছুটে আসা, উনিই তো বলেছেন, ভাইয়ের জন্য তাই ভালোবাসো, যা নিজের জন্য ভালোবাসো! আমার কত ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, অধীর অপেক্ষায়। এই একটু সুযোগের জন্য। আমি একটু আগেই ছিলাম তাদের স্থানে, আমি জানি তাদের দিলের অবস্থা। তাই মনের তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, বসে থাকলাম না, আর নামাজের নিয়ত করলাম না। উঠে দাঁড়ালাম বেরিয়ে গিয়ে আরেকজনকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা যে ভিন্ন ছিল, সেটা আমার কল্পনাতেও ছিল না!

দাঁড়ানোর সাথে সাথেই শুরু হলো আযান! সুবহানাল্লাহ! কি সুন্দর, অপার্থিব আযান ! কিন্তু এখনও তো ফজরের অনেক বাকি, তবে এটা কিসের আযান? বুঝতে পারলাম একটু পরেই, এটা 'কিয়ামুল লাইল' বা তাহাজ্জুদের আযান। আরও আশ্চর্য হলাম এই দেখে রিয়াদুল জান্নাতের প্রবেশ পথগুলো আটকে দেয়া হলো, বাইরে থেকে আর কেউ ঢুকবে না। আজানের সাথে সাথে রিয়াদুল জান্নাতে আর ঢোকা যায় না, চাইলে বের হওয়া যায়। তারমানে এখন বেশ কিছুক্ষনের জন্য 'জান্নাতের টুকরার' এই ছোট জায়গাটা আমার, কেউ বের করে দিবে না! নিজের সৌভাগ্য বিশ্বাস করতেও বেশ কিছুক্ষন সময় লেগে গেলো। ঘোর কাটতেই জামাত দাঁড়িয়ে গেলো কিয়ামুল লাইলের জন্য।

তিলাওয়াত শুরু হতেই পেয়ে গেলাম আরও একটা উপহার। ছোট বেলা থেকে যাদের তিলাওয়াত মনের মধ্যে গেথে আছে, অনেক নতুন জনপ্রিয় ক্বারীদের ছাপিয়ে যাদের তিলাওয়াতই বারবার শুনতে থাকি, আমার কাছে সেরকম একজন প্রিয় ক্বারী হলেন মসজিদে নববীর প্রবীণ ইমাম, আলী আব্দুর রহমান আল হুযাইফী। মনে মনে খুব ইচ্ছা ছিল, এবার যেন মদিনায় উনার নামাজ পাই। আর সেটা পেয়ে গেলাম একেবারে প্রথম থেকেই! সেই পরিচিত আওয়াজ কানে আসতেই কান্না এসে পড়লো। কত গাম্ভীর্যপূর্ণ সেই তিলাওয়াত, কত স্পষ্ট মাখরাজ, কতটা নিখুঁত, consistent তাজবীদ। সত্যিই বলেন আল্লাহওয়ালারা, মক্কা-মদিনায় এসে, এরকম দু'রাকাত নামাজ পড়লে, মনে হয় যা কিছু খরচ হয়েছে সব উসুল। মুগ্ধতায় উপভোগ করলাম সেই নামাজ।

কিয়ামুল লাইল শেষ হলো, ফজরের আজানের তখনও কিছু সময় বাকি। ভাবছিলাম এখন বোধহয় ছেড়ে দিতে হবে জায়গা। কিন্তু না, কারও কোনো মুভমেন্ট দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, জান্নাতের বাগানে থাকার সৌভাগ্য আরো বর্ধিত হচ্ছে। দুআয় লেগে গেলাম এবার, মন খুলে, প্রাণ ভরে দুআ করতে লাগলাম। এর মধ্যেই আজান পড়লো ফজরের। নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে গেলো সবাই। ফজরের জামাতে আবারো কারী হুযাইফীর তিলাওয়াত, আবারও কান্না, আবারও মুগ্ধতা।

সব সুন্দর সময় শেষ হবেই দুনিয়ার জীবনে। আল্লাহর প্রতি এই দুই ঘন্টার জন্য যতই কৃতজ্ঞতা জানাই, সেটা যথেষ্ট হবে না কখনোই। আলহামদুলিল্লাহ বলতে বলতে সামনের দিকে দিয়ে বের হয়ে এলাম রিয়াদুল জান্নাহ থেকে। প্রিয় নবীজির যিয়ারত, রিয়াদুল জান্নাতে অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ এই সুযোগ, সব মিলে এই রাতটা ছিল একটা স্বপ্নময় রাত। নবীর দরজায় অভ্যর্থনার, উপহারের রাত।


---------------------------------------------------------------------------------------------------------------

হোটেলে ফিরে এসে বেশিক্ষণ ঘুমানোর সময় পাইনি, নাস্তার সময় হয়ে গিয়েছিলো। আমার রুমমেট ছোট ফুপা টের পেয়েছেন আমি সারা রাত রুমে আসিনি। সেই সুবাদে বাবা মা-ও জেনে গেছে। নাস্তার টেবিলে তাই তারা একটু থমথমে। চিন্তিত, এই ছেলে যে এই কয়দিন আর কত কি পাগলামি করবে!

Thursday, March 16, 2017

বৃষ্টির জলে ভেসে বেড়াই

[লেখাটা বৃষ্টি নিয়ে, তাই ব্যাকগ্রাউন্ডে বৃষ্টির সুর থাকলে মনে হয়ে মন্দ হয় না, কি বলেন? 
তাহলে হেডফোন লাগিয়ে ,পাশের প্লে বাটনে ক্লিক করুন ! সাথে এক চা হলে আরও ভালো ]



এশার নামাজে যাওয়ার সময় বৃষ্টি ছিল না। বৃষ্টির লক্ষণ ছিল, তবে লক্ষ্য করার সময় ছিল না। নামাজের মধ্যেই ঝিরঝির শব্দ পেলাম। বুঝলাম, আজ বাসায় ফিরতে দেরি হতে পারে। 


আয় বৃষ্টি ঝেপে...

নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের মুসল্লিদের বড় অংশের মধ্যেই প্রচন্ড একটা তাড়া থাকে। কবি আমাদের অন্তরের কথা জানতে পারলে হয়তো লিখতেন,

অস্থিরতা বৃদ্ধি পাইতেছে, অন্তর জ্বলিয়া যাইতেছে,
মসজিদের ভেতর যে আটকা, সে কি করিয়া শান্ত হইতে পারে ....


As expected, নামাজ শেষে মসজিদের গেটের কাছে এসে দেখি অনেক অস্থির মুসল্লিদের ভিড়, বেরোতে পারছে না। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আটকে পড়া ভাইয়েরা অসহায় দৃষ্টিতে বৃষ্টি দেখছে। গেটের সামনে দোতলায় উঠার প্রশস্ত সিঁড়ি। আমি কয়েক ধাপ উপরে উঠে বসে পড়লাম, ঠিক স্টেডিয়াম বা সিনেপ্লেক্সের গ্যালারিতে বসার মতো। কারণ বৃষ্টি আমার কাছে একটা enjoyable জিনিস, একটা Source of entertainment । তবে রাতের বেলায় বৃষ্টি দেখা যায়না। গাড়ির আলোর সামনে কেবল বৃষ্টির ধারাটা দেখা যায়, ল্যাম্পপোস্টের বাতিটার ঠিক নিচের কিছু ফোটা দেখা যায়, পিচ ঢালা রাস্তায় পড়তে থাকা ফোটাগুলো দেখা যায়। তবে আমি এখন বৃষ্টি দেখতে চাচ্ছিনা। আমি চাচ্ছি বৃষ্টি শুনতে, বৃষ্টি শুঁকতে। বৃষ্টির দৃশ্য, গন্ধ, শব্দ, সবই উপভোগ করার জিনিস।

তাই মসজিদের 'গ্যালারিতে' বসে আমি চোখ বন্ধ করলাম….




বৃষ্টির রূপ সব জায়গায় এক না। নদীর তীর, বা গহীন বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে বৃষ্টির চেহারা একরকম, আর ব্যস্ত শহরের রাস্তায় নামা বৃষ্টির সিনারি সম্পূর্ণ আরেকরকম। এখানে বৃষ্টির সাথে থাকে বৃষ্টিতে পড়া মানুষের মধ্যে নানান গোছের চরিত্র। পথচারীদের অধিকাংশ কোনো না কোনো দোকানের সামনে ফুটপাথের সরু অংশে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার দোকান বা মার্কেটের ভেতরে ঢুকে পড়বে। দোকানে মানুষ আসলে দোকানদারের খুশি হবার কথা, তবে এদের দেখে মোটেই খুশি হয়না। কারণ এরা শুধুই টাইম পাস করবে, বৃষ্টি ভেজা হাতে এটা ওটা নেড়েচেড়ে দেখবে, দাম জিজ্ঞেস করবে, জুতার কাদা দিয়ে ফ্লোর নোংরা করবে। দোকানদারদের সম্ভবত ইচ্ছা করে এদের উপর একটা নির্দিষ্ট মূল্যের পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক করতে। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে চাইলে কিছু কিনতে হবে, এমনি এমনি ঢোকা যাবে না।


যেসব শিশুদের ঠিকানা রাস্তা, বৃষ্টি বোধহয় তাদের জন্যই সবচেয়ে আনন্দের। এরা একেবারেই অকারণে একজন আরেকজনের পিছনে দৌড়াতে থাকবে, টানাটানি করবে, নিজেদেরই কোন একটা পিচ্চিকে টেনে ফেলে দেবে, জমে থাকা পানিতে লাফাবে। আর তাদের মুখে থাকবে একশোভাগ ভেজালমুক্ত এক ফালি হাসি। 

বৃষ্টি দেখার জন্য কিন্তু ওভারব্রিজগুলো দারুণ !

কিছু অতি সাবধানি লোক যারা বছরের ৩৬৫ দিনই ছাতা সাথে রাখে, তারা আজকে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বুক ফুলিয়ে হেটে যাবে আটকে পড়া লোকদের সামনে দিয়ে। এছাড়া কিছু কবি, ভাবুক টাইপ ভার্সিটির ছাত্র জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বিকারহীন ভাবে ভিজে ভিজে হাটবে। সব মানুষ বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়া ভিজতে ভিজতে হাটবে, এটাই যেন জগতের স্বাভাবিক নিয়ম। এই শেষোক্ত দুই প্রজাতির উপর বাকিরা সবাই চরম বিরক্ত। সেটাই স্বাভাবিক।




প্রাকৃতিক পরিবেশে বৃষ্টিতেও অবশ্য অনেক চরিত্র থাকে, তবে তাদের এতো সহজে দেখা যায়না। দেখা গেলেও, তাদের অনুভূতি খুব কম মানুষই বোঝার ক্ষমতা রাখে। প্রকৃতির মাঝে বৃষ্টি উপভোগ করার সুযোগও আমার হয়েছে অনেক। মালয়েশিয়ায় পড়ালেখা জীবনে বেশ কিছু মাস পার করেছি যে হোস্টেলে, সেটা ক্যাম্পাসের একেবারে প্রান্তে। হোস্টেলের বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় পাহাড়ি এলাকায় কোনো রিসোর্টে এসেছি। চোখের সামনে সবুজ আর সবুজ। বিল্ডিংয়ের দেয়াল ঘেষে শুরু ঘাসের সবুজ, তারপর বিস্ত্রিত পাম গাছের বন, আর তার ওপারে গাঢ় সবুজ জঙ্গলে মোড়া পাহাড়। আর মাথার উপর বিশাল আকাশ। এই আকাশটা যে এত বড়, এতো প্রশস্ত, এটা এই ক্যাম্পাসে না আসলে মনে হয় বুঝতাম না। এখানে বিল্ডিংগুলো এমনিতেই ছোটছোট, তাও আবার অনেক দূরে দূরে। তাই আকাশটা তার সমস্ত সুবিশাল সৌন্দর্য নিয়ে সবসময় দেখা যায়। উপরে না তাকালেও দেখা যায়। মেঘ না থাকলে এই আকাশ আশ্চর্য রকম ঝকঝকে একটা নীল, তার মধ্যে যখন সাদা মেঘগুলো ভাসে, চোখ সরানো যায়না। আর ধুলোবালি না থাকার কারণে কিনা জানিনা, ওখানে আকাশটাকে কেন যেন অনেক বেশি কাছে মনে হয়। যেন কয়েকতলা দালানের ছাদে উঠলেই ধরা যাবে।


নীল, সাদা, সবুজ

এই আকাশ মেঘে ভর্তি হতে, বৃষ্টি ঝরাতে কোনো সময় নেয় না এখানে। আর এই বৃষ্টির সময়টাই আমি সবচেয়ে এনজয় করতাম। হোস্টেলের ঐ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত যে বৃষ্টি দেখেছি তার হিসাব নেই। কখনো বৃষ্টি নামতো শান্তভাবে। এই বৃষ্টিতে গাছপালা আর পাহাড়গুলোকেও বেশ শান্ত আর শান্তিময় মনে হতো। পাখিদের দেখতাম পাতার ছায়ায় চুপচাপ বসে আছে। পাতা দিয়ে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারছে না, বাঁচার চেষ্টাও করছে না। পরিচিত বানরগুলোও ভিজছে। দুষ্টু টাইপের পিচ্চি বানরগুলো সবসময়ই লাফায়, এই বৃষ্টি সেটা আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে কয়েকটা বেশি ছোট বা ভীতু টাইপের বাচ্চা মায়ের বুক জাপটে ধরে ঝুলে থাকে। মানুষ আর বানর খুব লাকি প্রজাতি, এরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মাকে জাপটে ধরতে পারে।

তবে কখনো সেখানে বৃষ্টি নামতো প্রচন্ড একটা রূপ নিয়ে। সেটা হঠাৎ করে আসতো না। এই বৃষ্টির আগমনের অনেক প্রস্তুতি। নীল আকাশ আস্তে আস্তে কালো হতে থাকে। রাগী চেহারার মেঘগুলো জড়ো হতে থাকে স্তরে স্তরে। মেঘের লেয়ার যত বাড়ে, ততো আকাশ কালো হতে থাকে। কখনো একেবারে ভর দুপুরে আলো কমে যায় এতটাই, যে মনে হয় মাগরিব এর ওয়াক্তের একেবারে শেষ সময়। প্রস্তুতি চলে বাতাসেও, তবে সেটা আবার সবসময় এক রকম না। কখনো দমকা বাতাসে জানালাগুলো ভেঙে যেতে চায়, বারান্দায় শুকাতে দেয়া পাঞ্জাবীগুলো উড়ে ঢুকে পড়ে করিডোরে। আবার কখনো ঠিক উল্টো, বাতাস একেবারে থেমে যায়। গাছগুলো থম মেরে যায় ভয়ে। দুষ্টমতি বানর পিচ্চিগুলোকে জোর করে ধরে নিয়ে মায়েরা কোথায় যেন চলে গেছে। পাখিদেরও কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। ওদের কি কোনো ইমার্জেন্সি শেল্টার আছে? আমাদের যেমন থাকে বন্যার সময়?

আকাশ ফেটে পড়ার অপেক্ষায়

এমন সময় ফোটা পড়া শুরু করে, এক দুই ফোটা করে। বাড়তে থাকে বৃষ্টি, বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে। বৃষ্টি বেড়ে কোন পর্যন্ত যেতে পারে, সে সম্পর্কে পূর্বের সব ধারণা ভেঙে দিয়ে বৃষ্টি আরো বাড়তে থাকে! পানির ধারা যেন ঘোলা কোনো পর্দা, আকাশ থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে বাতাসের সাথে ভেসে আসে পানির ফোয়ারা। কোনো ছাতা, কোন ছাদ এই বৃষ্টি থেকে বাঁচাবে না। ভিজিয়েই ছাড়বে। এরকম প্রতাপশালী বৃষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না, সেটা ভেবে থাকলেও ভুল হবে। বৃষ্টির ট্যাংকি যেন খালিই হয়না। ঘন্টার পর ঘন্টা চলতেই থাকে।

বৃষ্টি শেষেও চমকের শেষ নেই। আকাশ পরিষ্কার হতে হতেই, সামান্য দূরের ঐ পাহাড়ি বনে দেখা যায় আরেক আজব দৃশ্য। সবুজের ফাঁকে ফাঁকে, এখানে ওখানে মেঘের মতো ধোঁয়া উঠছে। আকাশ থেকে নামা পানি আবার দল বেঁধে আকাশে চলে যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম বৃষ্টির আকাশে ফিরে যাওয়া।



আমি সবসময়ই শব্দের দ্বারা অনেক বেশি influenced হই। কর্কশ, বিকট আওয়াজ যেমন মেজাজ খারাপ করে দেয়, ঠিক তেমনি সুন্দর কোনো শব্দও মুহূর্তের মধ্যে আমার মন ভালো করে দিতে পারে। মনের উপর শব্দের ইফেক্টের এই বেপারটা বেশিরভাগ মানুষই ঠিক বুঝে না, অথবা পাত্তা দেয় না। আমার ধারণা ঢাকাবাসীরা বিশেষ করে শব্দের প্রভাব থেকে desensitized হয়ে গেছে ছোটবেলাতেই। শব্দ দূষণ আমাদের কানকে পঁচিয়ে দিয়েছে। তবে কোনো কারণে আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। সেকারণে সুবিধা অসুবিধা দুটাই হয়েছে। অসুবিধা হলো, বাসে উঠতে হয় অলমোস্ট প্রতিদিনই। সেখানে টিকে থাকার জন্য প্রায় সবসময়ই আমার কানে হেডফোন থাকে। আর সুবিধা? আমি প্রকৃতির শব্দ, বিশেষ করে বৃষ্টির শব্দ সম্মোহিতের মতো শুনতে পারি। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখিইনা, চোখ বন্ধ করে শুনি পানির কুলকুল। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শুনি পাতার ঝিরঝির। প্রতিটা পাখির গান আলাদা করে ফেলি ওদের সম্মিলিত কোরাস থেকে। ঐযে বললাম বাসে বসে হেডফোন কানে দেই, কি চলে সেখানে? কখনো বৃষ্টির, কখনো লেকের পাড়ের, কখনো বনের ভেতরের ‘সুর’।

আর এই শব্দের দুনিয়ায় শহরের বৃষ্টি প্রকৃতির চেয়ে অনেক এগিয়ে, অন্তত আমার অভিজ্ঞতায়। হোস্টেল থেকে প্রাকৃতিক এলিমেন্টগুলো কিছুটা দূরে হওয়ায়, সেখানে বৃষ্টির শব্দে কেবল একটাই বাদ্য বাজতো, গাছের পাতায়, বা ঘাসের উপর ফোটা পড়ার শব্দ। কিন্তু শহরে বৃষ্টির সুরে instruments এর অভাব নেই! বৃষ্টির একটা বড় অংশ পড়ে পিচঢালা পথে, ঝিরঝির করে এক নাগারে। এটাই মূল Rhythm। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বড়লোকের গাড়ির মোটা গ্লাসে বৃষ্টি পড়ছে ভারী স্বরে, পড়-পড়, পড়-পড়...। টং দোকানের টিনের চাল বাজাচ্ছে টুং-টাং ধ্বনি, আবার চালের ফুটোর নিচে পেতে রাখা ফাঁটা বালতিতে পড়ছে টুপ-টাপ! রাস্তায় ফেলে রাখা সিগারেটের প্যাকেটটাও চুপ করে নেই, পট-পট  করছে। পাশের পাঁচতলা বাড়ির ছাদের পানি পাইপ দিয়ে ছের-ছের  টাইপের একটা শব্দ করে পড়ছে ফুটপাথের মাঝখানে। নদী না থাকলেও কুলকুল  শোনা যাচ্ছে, রাস্তা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ড্রেন থেকে!

আহা কি আনন্দ.....

এসব চরিত্রের নাটক দেখার জন্য, এতসব বাদ্যযন্ত্রের composition শুনার জন্য অবশ্য আমার মতো বেকার মানুষ লাগে। সবাই তো আর বেকার না! তবে একদিন হোস্টেলে আমার পাকিস্তানি রুমমেট আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, বৃষ্টির শব্দ শুনতে শহরেই বেশি মজা, অনেক রকম সাউন্ড পাওয়া যায়। আজব তো! আমার মতো তারমানে অনেকেই ভাবে? নিজেকে unique একজন, সবার থেকে আলাদা কিছু একটা ভাবতে যতই ভালো লাগুক, আসলে আমরা কেউই তা না। অনেকেই আছে আমার মতই, অথচ কেউই ঠিক আমি না! বেপারটা কিছুটা দুঃখজনক, এবং একই সাথে ইন্টারেস্টিং।




দেখুন অবস্থা! ছিলাম বসে সেই মসজিদের সিঁড়িতে, চলে গেলাম কত দূর-দূরান্তে, বৃষ্টির পিছে পিছে। এই বৃষ্টি জিনিসটাই এমন, সবসময় আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, মোহাবিষ্ট করে রাখে। আমি সময়, স্থান ভুলে যাই। Norms ভুলে যাই। সেদিনও ভুলে গিয়েছিলাম। তাই ১৫ মিনিট বসে থেকে বৃষ্টির মধ্যেই নেমে পড়েছিলাম রাস্তায়। দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি পড়া হুজুর পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে রাস্তায় রাতের বৃষ্টিতে হাসি-হাসি মুখ করে ভিজছে, এই দৃশ্যটা অন্যদের কাছে কেমন লাগবে, সেটা ভাবার কথা মনে আসেনি। ১০-১৫ মিনিট পরে কাক ভেজা হয়ে সেদিন বাসে উঠেছিলাম, ১ ঘন্টার জ্যামে বাসে বসেই শুকিয়ে গেছি, তাই বাসার মানুষেরা টের পায়নি! বৃষ্টির এরকমই এক আশ্চর্য দখল আমার উপর।



আজকে এই ভর দুপুরে রোদটা একটু কম কম লাগছে। 
আকাশে কি তাহলে কিছু মেঘ আছে? 
বৃষ্টি নামবে নাকি??

Friday, February 24, 2017

চশমাটা খসে গেলে....

চশমা পড়ি সেই ছোট্ট বেলা থেকে। একেবারে ছোট বয়স থেকেই আমার চোখের সামনে দুটো কাচের টুকরো থাকে সবসময়, অন্তত জাগা অবস্থায়। ৫-৬ বছর বয়সে আমার সেই প্রথম চশমা-পড়া চেহারার বেশ কিছু ছবি আছে এখনো। আমি নাকি সেই চশমা আবার একটু পরপর নাক লম্বা করে, ভ্রূ উঁচু করে এডজাস্ট করতাম। সেটা নিয়ে এখনো প্রায়ই হাসাহাসি হয় বাসায়। সেই চশমাটা এখনো আছে আমার ড্রয়ারে। গোছাতে গিয়ে যখন মাঝে মাঝে হাতে আসে ওটা, কিছুক্ষনের জন্য থেমে যেতেই হয়, হাসি পায়। 

সেই যে চশমা ঝুললো চোখে......


চোখের পাওয়ার কমতে কমতে, আর চশমার পাওয়ার আর দাম বাড়তে বাড়তে এখন যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা রীতিমতো দুঃখজনক। বিশেষ করে বাম চোখটার অবস্থা এতই খারাপ যে এটা লেজার ট্রিটমেন্টের অযোগ্য বলে দিয়েছেন এক ডাক্তার। তবে সবসময় চশমা হাতের কাছে থাকে বলে, এটার অভাব বা আমার শোচনীয়তার পরিমানটা টের পাইনা খুব একটা। তবে যখন টের পাই, বেশ অসহায় লাগে।

এরকম একটা এক্সপেরিয়েন্স হয়েছিল সুন্দরবনে। সেটা ছিল আমাদের আহসানুল্লাহর ব্যাচের ফেয়ারওয়েল ট্রিপ, একশো জনের উপর ছাত্র ছাত্রী নিয়ে। প্রচন্ড exciting সেই ট্রিপ এর কাহিনী লিখেছিলাম আগে একবার। তো সেবার কটকা বীচে, দোস্তদের সাথে সাগরের পানি দাপাদাপিতে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত অনিন্দ বললো, ঢেউ আসলে ঢেউয়ের নীচে মাথা দে, মজা লাগে। তাই নাকি? ট্রাই করে দেখা লাগে। মিডিয়াম সাইজের একটা ঢেউ আসতে দেখে ডুব দিলাম, মাথার উপরে ভেঙে পড়ল পানির টিলা। একটু পরেই আবার পানি সরে যেতে লাগলো যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে।ভুল বলেনি, আসলেই মজা। পানির উপর মাথা উঠিয়ে চিন্তা করছি আবার একটা দেয়া লাগে, কিন্তু মনে হলো, কি যেন একটা সমস্যা আছে। Something's not right. বেপারটা বুঝলাম একটু পরেই। আমার চশমা নাই। ঢেউয়ে ভেসে গেছে! আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা বীচে উঠে আসলাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কারণ চশমা ছাড়া আমি এতটাই কানা যে রীতিমতো আতঙ্ক কাজ করে। চশমার এক জোড়া স্পেয়ার ছাড়া কখনোই কোনো সফরে বের হয়নি, সেবারও না। তবে সেটা ছিল লঞ্চে, ব্যাগের ভেতর। স্টেইন্ড গ্লাসের ভেতর দিয়ে দেখার মতো বন্ধুদের শুধু ভৌতিক অবয়বগুলো দেখতে লাগলাম, পানিতে নেমে উদ্ভট কিসব যেন করছে। বেশ কিছু পরে লঞ্চে ফিরে আবার 'প্রাণ' ফিরে পেলাম চোখে।

কয়েকদিন আগে আবারো সেই অসহায়ত্বের একটা ছোট ডেমো পেলাম। কাহিনী যদিও সিম্পল। মিরপুরে IELTS ক্লাস নেয়া শেষে এশার নামাজ পড়বো মসজিদে। জামাত শেষ বেশ আগেই। ওযুর সময় আমি সবসময় চশমাটা ঝুলাই পিছন দিকে, মানে দুই কাঁধের মাঝে, জামার সাথে। ওযু শেষে চশমা পেছনে ঝুলিয়ে রেখেই মসজিদে ঢুকলাম। মসজিদের একেবারে সামনে কিছু লাইট ছাড়া বাকিগুলো অফ। পিছনে এক পাশে জুতা রাখার জন্য নিচু হতেই চশমাটা পরে গেল কার্পেটের উপর। ডার্ক লাল রঙের কার্পেট, তার উপর কালো কাজ করা। এদিকে আলো কম কিছুটা। মাথা নিচু করে খুঁজতে লাগলাম। কোনো চিহ্ন নেই। পা দুটোকে সেন্টারে রেখে মাথা ঝুকিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগলাম। No use. পেছনের কিছু মুসল্লি হা করে তামাশা দেখছে, হয়তো করুনা নিয়ে, হয়তো না। আত্মসম্মান তাও কিছু বাকি ছিল তখনো। কিন্তু কিছুতেই খুঁজে না পেয়ে শেষমেষ যখন হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়াতে লাগলাম, তখন সেটাও আর বাকি থাকলো না। তবে বেশিক্ষন এই অপমানজনক পজিশনে থাকতে হলো না, হাতে এসে বাজলো আমার precious চশমা।

পুরো ঘটনাটা খুব অল্প সময়ের, আর তেমন একটা সিগনিফিক্যান্ট কিছুনা, তবুও আমার অনেক হাসি পেলো। বেশ কিছু অনুভূতি খেলে গেল মাথায় একসাথে। প্রথমেই মনে হলো, দুটো স্বচ্ছ কাঁচের টুকরোর উপর আমি কত ডিপেন্ডেন্ট! আর ভাবলাম, আমি তো তাও চশমা পরে ঠিকঠাক দেখি, কত মানুষের তো সেই সুযোগও নেই! 

আর সেই সাথে ভাবলাম, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের সম্মানিত করতে পারেন, আবার সাথে সাথেই ছোট করতে পারেন। এই একটু আগেই ক্লাস ভর্তি ছাত্রের সামনে আমার কত পার্ট। আমি খুব ভালো ভাব নিতে পারি, ক্লাসে সেই যোগ্যতার পূর্ণ ব্যবহার করি, ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই তাই বয়সে সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও বেশ রেসপেক্ট করে। অথচ তার একটু পরেই, আল্লাহ আমাকে মসজিদের মেঝেতে গাধার মতো চার হাতপায়ে একটু ঘুরিয়ে নিলেন। কোথায় গেল ক্লাসের ঐ স্মার্ট আসিফ স্যার? 

আসলে আমাদের অহংকারের কিছুই নেই। নিজেদের অবস্থার উপরে বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ আমাদের নেই। সর্বাবস্থায় আমরা আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। সেটাই আল্লাহ মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেন। মনে যে করিয়ে দেন সেটাতেও আল্লাহরই শুকরিয়া, উনি তার মানে ভাবছেন আমার কথা? আর তাঁর মনে পড়ানোতেও যে আমাদের মনে পড়বে তাঁর কথা, সেটাও তাঁর ইচ্ছায়। কত মানুষ আল্লাহর দেখানো বড় বড় ইঙ্গিতেও অন্ধ থেকে যায়। আল্লাহ যে আমাকে বাইরের এবং ভেতরের চোখে পুরো অন্ধ করেননি, তাই শুকরিয়া। আল্লাহ আমাদের দৃষ্টিকে আরো স্পষ্ট করে দিন। আমীন।